কুড়িগ্রামের উলিপুরে বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের জনতারহাট–সাকোয়ারপাড় সড়কের একটি সেতু ভেঙে পড়ে আছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। ২০১৫ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সেতুটি আজও পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন আশপাশের অন্তত সাতটি গ্রামের মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও স্বাভাবিক যান চলাচল। অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ধরনা দিয়েও মেলেনি স্থায়ী সমাধান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে জনতারহাট–সাকোয়ারপাড় সড়কের একটি খালের ওপর ২০১৩–১৪ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় প্রায় ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হামিদ ট্রেডার্স সেতুটি নির্মাণ করে। তবে নির্মাণের এক বছরের মধ্যেই ২০১৫ সালের বন্যায় ব্রহ্মপুত্র নদের উপচে পড়া পানির প্রবল স্রোতে সেতুর নিচের মাটি সরে যায়। এতে সেতুটি দেবে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এরপর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে খাল পার হতে কলার ভেলা ও ডিঙি নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে। অন্যদিকে, শুকনো মৌসুমে সেতুর ভাঙা অংশ এড়িয়ে অনেকটা পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হয়। বন্ধ হয়ে গেছে এ পথে সরাসরি যানবাহন চলাচল। ফলে দৈনন্দিন কাজে সময় ও অর্থ দুটিই বেশি ব্যয় হচ্ছে এলাকাবাসীর।
ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতঃ
সেতুটি ভেঙে পড়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। স্থানীয়দের দাবি, সেতুর দুই পাশে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থীকে এই পথ ব্যবহার করতে হয়। বর্ষায় খালের পানি বেড়ে গেলে অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে চায় না। এতে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমে যায়।
জনতারহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিমা খাতুন বলে, বর্ষা মৌসুমে আমাদের স্কুলে যেতে ভয় লাগে। খাল পার হতে ঝুঁকি নিতে হয়। এ সময় অনেকে স্কুলে যায় না।
খারিজা কামাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, সেতুর এপারে-ওপারে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের চলাচলে খুব কষ্ট হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন।
কৃষিপণ্য পরিবহনেও ভোগান্তিঃ
সেতুর অভাবে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। খালের ওপারে থাকা কৃষিজমিতে যাতায়াত এবং উৎপাদিত ফসল বাড়িতে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ধান ও পাট কাটার মৌসুমে পরিবহনসংকট আরও প্রকট হয়।
বোতলা গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, সেতুর ওপারে আমাদের চাষের জমি রয়েছে। সেখানে যেতে অনেক ঘুরে যেতে হয়। ধান-পাট কাটার পর বাড়িতে নিয়ে আসতেও সমস্যা হয়। ছোটখাটো ব্যবসা করেন, এমন লোকজনও ভোগান্তিতে পড়েছেন।
দলন গ্রামের গৃহিণী মনজিলা বেগম বলেন, ‘সেতুটি না থাকায় আমাদের কষ্টের শেষ নেই। আমার স্বামী অটোরিকশা চালান, কিন্তু এই পথে যেতে পারেন না। কেউ অসুস্থ হলে অন্য পথ ঘুরে তাঁকে নিয়ে যেতে হয়। ভোটের সময় জনপ্রতিনিধিরা এসে অনেক আশ্বাস দেন, কিন্তু সেতুটি আর নির্মাণ হয় না।
দুর্ভোগ সাত গ্রামের মানুষেরঃ
স্থানীয় যুবক জনাব আলী বলেন, সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় দলন, বোতলা, পাঁচগ্রাম, নদীরপাড়, তেলিপাড়া, পানাতিপাড়া ও বটতলা গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। খারিজা কামাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জনতারহাট উচ্চবিদ্যালয়, মুসল্লীপাড়া দাখিল মাদ্রাসা ও বুড়াবুড়ি হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও তাঁরা কোনো সমাধান পাননি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেতুটি পুনর্নির্মাণের আশ্বাস বারবার দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে বছরের পর বছর ঝুঁকি ও ভোগান্তি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে তাঁদের। দ্রুত সেতুটি নির্মাণ করে জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
আগামী অর্থবছরে নির্মাণের প্রস্তাবঃ
এ বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ টি এম বেনজির রহমান বলেন, ‘জনগুরুত্বপূর্ণ সাকোয়ারপাড় সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছর সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হবে।’
সেতুটি পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানোর কথা জানালেও কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া যায়নি। ফলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে কবে মুক্তি মিলবে, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।